নীতি নৈতিকতার শিক্ষা

নৈতিকতার শিক্ষা নিন মানসিকভাবে ভাল থাকুন!

নৈতিকতা (“Morality”) (ল্যাটিন শব্দ “মোরালিটাস” থেকে আগত, যার অর্থ চরিত্র, ভদ্রতা, সঠিক আচরণ, ভাল (বা সঠিক) এবং খারাপ (বা ভুল) বিষয় সমূহের মাঝে উদ্দেশ্য সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়া সমূহের পার্থক্য ও পৃথকীকরণ | নৈতিকতাকে একটি আদর্শিক মানদন্ড বলা যেতে পারে যা বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিকতা, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতির মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে| আবার অনেক ক্ষেত্রে, সামগ্রিকভাবে সমগ্র পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর বিষয় সমূহকেও নৈতিকতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়|

নৈতিকতাকে দার্শনিকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। শাদামাটা কথায়, ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ এবং সাধারণ সততার আচরণিক বহিঃপ্রকাশকে নৈতিকতা বলে। নৈতিকতা বিষয়টি ব্যবহারিক, যা সরাসরি আচরণের সঙ্গে জড়িত।  আধুনিক পাশ্চাত্য দার্শনিক বেকন-হবস-লকের মতে, নীতি বিজ্ঞানের চরিত্র শেষ পর্যন্ত প্রয়োগিক। তাঁদের মতে, নৈতিকতার সর্বজনীন নিয়ম বলে কিছু নেই। সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে এর রকমফের রয়েছে। যাপিত জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাতে সমাজ-সংস্কৃতি-অর্থনীতির কাঠামোর প্রভাবে নৈতিকতা একটি রূপ লাভ করে।

বাংলায় নৈতিক শিক্ষার ওপর সর্বপ্রথম গুরুত্ব প্রদান করেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনিশ শতকের মাঝামাঝি নৈতিক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন। তিনি নিজেই নৈতিক শিক্ষার উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে পাঠ্যবই রচনা করেন ও কয়েকটি বিদেশি বই অনুবাদ করেন।

বিশেষ্য ‘নীতি’> বিশেষণ ‘নৈতিক’> বিশেষ্য ‘নৈতিকতা’। নীতি হলো ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের ধারণা। নীতি আপেক্ষিক, বরং বলা যায় ব্যক্তিক। ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন : ‘মানুষ আসলে তা-ই, যা সে ভাবে।’ আমি যদি ভাবি মিথ্যে বলা তেমন দোষের কিছু না, তাহলে তার কাছে সেটাই সঠিক। নীতি থেকে উদ্ভূত বলে নৈতিকতা: জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের বোধও আপেক্ষিক।

এসব বিবেচনায় নৈতিকতাকে কোন সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডে ফেলে বিচার করা বেশ শক্ত। আমাদের দেশ যেটাকে চরম অনৈতিকতা বলা হচ্ছে অন্য দেশে সেটাকে খুবই নৈতিকতা সম্পন্ন বিষয় হিসেবে মনে করা হতে পারে।আমি আমার লেখার এই অংশে নীতি নৈতিকতার সংগা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বসিনি।বস্তুত: আমি আমাদের পরিবার, সমাজ দেশ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় যেটা সার্বজনীন সত্য সুন্দর ও আদর্শ সেটাকেই নীতি নৈতিকতার প্রকৃত মানদণ্ড হিসেবে বিচার করতে চাইছি।যা সুন্দর তা যেমন চিরকালের আনন্দ সামগ্রী, তেমনি যেটা সত্য ও ন্যয়ের দিশারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর, সেটাই আমার মত অনেকের কাছে নৈতিকতার প্রকৃত মাপকাঠি।

সর্বকালে, সব সময় দেশে দেশে  নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ছিল, আছে এবং থাকবে।  সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ, ব্যাভিচার, পরকীয়া, অ্যাসিড নিক্ষেপ, পিতা-মাতা কর্তৃক সন্তান বা সন্তান কর্তৃক পিতামাতার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা,  শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর শ্লীলতাহানি, কামুক পুরুষ দ্বারা জোর পূর্বক নারীর উপরে যৌন নির্যাতন , অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, অনাচার, অনাসৃষ্টি, অপকর্ম, দুর্নীতিপরায়নতা, এসব নৈতিকতা বিরোধী বিষয়গুলো নিয়ে আমাদেরকে কঠিনভাবে ভাবতে বাধ্য হবে।এসব বিষয়গুলো থেকে কেউ নিজেকে মুক্ত রাখতে পারলেই আমরা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তাকে নীতিবান মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। নীতিবাদ মানুষের উপরে সকল ক্ষেত্রে নির্ভর করা যায়, যায় তাকে বিশ্বাস করা; তাই নীতিবান মানুষ সর্বকালেই সাধারণ মানুষের কাছে ভারি আস্থার মানুষ হিসেবে বিবেচিত।

নৈতিকতার বিষয়টি পুরোটাই মনস্তাত্বিক। ফলে ব্যক্তির মধ্যে নৈতিকতার চেতনা জাগ্রত করতে হলে তাকে মানসিকভাবে তার মধ্যে মানবিকতার চেতনা জাগ্রত করাতে হবে। বোঝাতে হবে ভাল মন্দের পার্থক্য।যাদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা আছে, আছে মুত্যু-ভীতি তাদের মনের মধ্যে নৈতিকতাকে জাগ্রত করে তোলাটা অনেকটা সহজতর। এছাড়া যারা ধর্মকে বিশ্বাস করেনা তাদের মধ্যে ভাল-মন্দ ও ন্যয় অন্যায়ের বোধটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। এটা তো সর্বৈব সত্য যাদের মধ্যে ধর্ম শিক্ষা নেই তাদের মধ্যেও কিন্তু ভাল মন্দের বোধটা ঠিকই রয়েছে।দুশ্চরিত্র, কপটচারী,  ভণ্ড, প্রতারক, অন্যায়কারী ও পাপিষ্ট মানুষকে সভ্য সমাজের কেউ পছন্দ করেনা। কারুর মধ্যে ধর্ম বিশ্বাস থাকুক আর নাইবা থাকুক এটা তা ঠিক দুশ্চরিত্র, কপটচারী, অন্যায়কারী, ভণ্ড, প্রতারক, পাপিষ্ট মানুষের জীবনাবসানেও জীবিত মানুষ তাদের সম্পর্কে মন্দ কথা বলতে ছাড়ে না। এই বোধটা যদি নৈতিকতা বিরোধী মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলা যায় তাহলে তাদের  সম্বিত ফিরে আসতে পারে। এই সমাজে আমরা বহু মানুষকে দেখেছি যাদের অপকর্ম আর অন্যায় কাজের প্রাকৃতিক সাজা তাদের জীবদ্দশায় আপনিতেই হয়ে যায়।মানুষের মনোগত সাজার ব্যাপারটা কিন্তু বড়ই ভয়ঙ্কর! অনেক অনিষ্ঠকারীর প্রাকৃতিক সাজা দৃশ্যমান না হলেও তারা কিন্তু মানুসিক সাজা ঠিকই পেয়ে থাকেন। তাই আসুন আমরা আমাদের নিজেদের মধ্যে নীতি নৈতিকতার বোধ জাগ্রত করি এবং আমাদের আশে পাশের নিকটজনদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করার জন্যে যে যার অবস্থান থেকে চেষ্টা করি।

নীতি নৈতিকতার শিক্ষা হিসেবে যা করতে পারি:

(১)নিজেকে চিনুন, নিজেকে জানুন এবং নিজেকে বুঝুন;

(২)আপনার প্রতি মুহুর্তের চিন্তা চেতনা, আচার আচরণে ও কর্ম কথায় ভাবতে থাকুন:সত্য-মিথ্য, ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, পাপ-পূণ্য। এসব বিষয়গুলো চিন্তা করলে আপনার জন্যে খারাপ বা নৈতিকতা বিরোধী কাজ থেকে দুরে থাকা সহজতর হবে।

(৩)মনে রাখবেন, ক্ষমতা, অর্থ, খ্যাতি, যশের মৌরুসী পাট্টা কারুর জন্যে চিরস্থায়ী নয়। আজ বাদে কাল আপনার ক্ষমতা, অর্থ, খ্যতি, যশের শেষ হলে তখন কী হবে?

(৪)আপনার আমার অন্যায়, অবিচার, অপকর্মের সমালোচনা করতে কিন্তু মানুষ কখনো ছাড়ে না। জীবনে মরণে সর্বত্র সাধারণ মানুষ এবং ভূক্তভোগীরা কিন্তু অন্যায়কারীকে তুলোধূনা করতে ছাড়ে না। ঠাণ্ডা মাথায় যারা মানুষ ঠকায় যারা প্রতারক আর মোনাফেক এরা কখনো ছাড় পেতে পারে না;

(৫)ধর্মে বিশ্বাস করেন আর নাইবা করেন মনে রাখবেন আপনার অন্যায় অবিচার, অন্যাচার ও অত্যাচারের প্রাকৃতিক সাজা কিন্তু আপনাকেই পেতেই হবে। আর যদি ধর্মীয় আচার মেনে চলেন তাহলে তো আপনার পরকালের সাজা নিশ্চিত!

(৬)মনে রাখবেন, ভাল হতে পয়সা লাগে না।ভাল হওয়ার জন্যে আপনার ইচ্ছেশক্তিই যথেষ্ট।

(৭)আপনার আমার জীবনের মূল্যবান সময় ভারি কম, এর পরে কি হবে, কখনো ভেবেছেন কী?ছোট্ট জীবন শুরু করতে করতেই শেষ। খুব তাড়াতাড়ি নিভে যায় আমাদের জীবন প্রদ্বীপ; আবার ভাগ্য খারাপ হলে অকালে শেষ হতে পারে মূল্যবান জীবন।বস্তুত: এই জীবন প্রদ্বীপ আজীবন জ্বালিয়ে রাখার মত কোন মারণাস্ত্র আজ অব্দি কেউ তৈরি করতে পারিনি।

     তাই আসুন ক্ষণস্থায়ী এই পার্থিব জগতের কথা চিন্তা করে আমরা নিজেরা ভাল হতে চেষ্টা করি এবং আমার আপনার পাশের সবাইকে ভাল করতে চেষ্টা করি। আপনি আমি ভাল হলে আর নৈতিকতা ভিত্তিক জীবন গড়তে পারলে গোটা দেশ জাতি ও সমাজের চেহারাটা একদম বদলে যেতে পারে।

(তথ্য সূত্র: https://bn.wikipedia.org; https://www.amarblog.com ও আমার স্ব প্রণোদিত ভাবনা)