ইতিহাস ঐহিত্যখ্যাত মেহেরপুর

ইতিহাসের অনন্য সাক্ষী মেহেরপুর:

ইতিহাসের স্বর্ণপাতা থেকে অনেক অনেক পূর্বেই হারিয়ে গেছে মেহেরপুর এর নামকরণ সম্পর্কে যথাযথ তথ্যসমূহ। দীর্ঘকাল ধরে এ বিষয়ে ব্যপক লেখালেখি হয়েছে, তবুও বিষয়টি তামাশাচ্ছন্ন রয়ে গেছে। মেহেরপুর নামকরণ সম্পর্কে পর্যন্ত দুটি অনুমানসিদ্ধ তথ্য আমরা জানতে পেরেছি একটি হচ্ছে ইসলাম প্রচারক দরবেশ মেহের আলী। অপরটি হচ্ছে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ের বাংলায় ভ্রমণগ্রন্থ (১৯৪০); বচনকার মিহির ও তার পুত্রবধূ খনা এই শহরে বাস করতেন। মিহির নাম অনুসারে নামের উৎপত্তি হয়েছে। তবে, বেশির ভাগ মানুষের মতেই এই দুটি তথ্যের মধ্যে দরবেশ মেহের আলী এর নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই মেহেরপুরের নামকরণ করা হয়।

মেহেরপুরের নামকরণ যা কিছুই হোক না কেন,  বিভিন্ন যুগের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই মেহেরপুর। ইতিহাস ঐতিহ্যের অনন্য সাক্ষী হিসেবে মেহেরপুর জেলা স্ব-মহিমায় শির উন্নত করে নিজের অবস্থান কে জানান দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের সূতিকাগার হিসেবে খ্যতি রয়েছে মেহেরপুরের, সেটারও আগে মেহেরপুর নীলচাষ, আমঝুপির নীলকুঠির ষড়যন্ত্রে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন; এসবের অমর সাক্ষী মেহেরপুর জেলা।

আমঝুপি নীলকুঠির ইতিবৃত্ত:

বৃটিশ আমলে নীল চাষের উদ্দেশে ইংরেজরা ৭৪ একর জমির ওপর কালের সাক্ষী মেহেরপুরের ঐতিহাসিক আমঝুপি নীলকুঠি গড়ে তোলে। মেহেরপুর অঞ্চলে ১৭৭৮ সালে ক্যারল ব্লুম নামে এক ইংরেজ ব্যক্তি তৎকালীন নদীয়া জেলা বর্তমানে মেহেরপুরের আমঝুপির কাজলা নদীর তীরে ৩০০ বিঘা জমির উপর নীলকুঠি স্থাপন করেন। নীল চাষ অত্যাধিক লাভজনক হওয়ায় ১৭৯৬ সালে এখানে নীল চাষ শুরু হয়। এ সময় বিখ্যাত বর্গী দস্যু নেতা রঘুনাথ ঘোষালির সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে গোয়ালা চৌধুরী নিহত হলে মেহেরপুর অঞ্চলে রানী ভবানীর জমিদারীভুক্ত হয়। রানী ভবানী নিহত হবার পর হাত বদল হয়ে গোটা অঞ্চলটি মথুরানাথ মুখার্জির জমিদারীভুক্ত হয়। পরে তার ছেলে চন্দ্র মোহন বৃহৎ অঙ্কের টাকা নজরানা নিয়ে মেহেরপুরকে জেমস হিলের হাতে তুলে দেন। ১৮১৮ থেকে ১৮২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মেহেরপুরর বেশ কয়েকটি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়। তন্মধ্যে আমঝুপি, গাংনীর ভাটপাড়া, বামন্দি নীলকুঠি অন্যতম।

নীল গাছ পচা পানি জ্বালিয়ে তৈরি করা হতো নীল রঙ। এক বিঘা জমিতে আড়াই থেকে তিন কেজি নীল উৎপন্ন হতো,যা উৎপাদন করতে ব্যয় হতো ১২ থেকে ১৪ টাকা। অথচ চাষীরা পেতো মাত্র তিন থেকে চার টাকা। নীল গাছ থেকে যে রঙ তৈরি করা হতো তা ছিল চাষীদের বুকের পুঞ্জিভূত রক্ত। কথিত আছে রবাট ক্লাইভ প্রায়ই সময় কাটানোর জন্য মেহেরপুরের আমঝুপি নীলকুঠিতে আসতেন । ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ইংরেজরা চলে যাবার সময় পূর্ব পাকিস্থানের (বাংলাদেশ) সরকারের কাছে কাছে হস্তান্তর করে যায় এই কুঠিবাড়ি সহ ভূ-সম্পত্তি। কুঠি বাড়িটিতে রয়েছে শয়ণ কক্ষ, স্নেকপ্রুফ রুম, নাচঘর ও মৃত্যুকুপ। প্রচলিত রয়েছে এখানে নর্তকীদেরকে নাচতে হতো। যদি কোন প্রজা খাজনা কিংবা নীল চাষে অনীহা প্রকাশ করতো তাহলে তাকে হত্যা করে মৃত্যুকুপে নিক্ষেপ করা হতো। স্নেকপ্রুফ রুমটি একসময় এতটাই মসৃণ ছিল  যে সেখানে সাপ কিংবা পিঁপড়া চলতে পারতো না। এখানে রয়েছে ঘোড়ার ঘর, কয়েদখানা, কাচারী ঘর ও নায়েবদের আবাসন। ১৯৭৮ সালে ১৩ মে তারিখে খুলনা বিভাগ উন্নয়ন বোর্ডের আমঝুপি অধিবেশনে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংস্কার ও উন্নয়ন করা হয়। মেহেরপুর থেকে ৭ কিমি পূর্ব দিকে মেহেরপুর চুয়াডাঙ্গা রোডের পাশেই আমঝপি নীলকুঠির অবস্থান।

মেহেরপুর মানেই নীলকরদের ইতিহাস ও অত্যাচারের কাহিনি। আমঝুপি শুধু নীল চাষ আর নীলকরদের অত্যাচার নির্যাতনের কাহিনিতে ভরা নয়। এখানে ইতিহাসের এক কলংকজনক অধ্যায় যেমন রচিত হয়েছে, তেমনি রয়েছে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল জেগে ওঠার গল্পগাঁথা।

মোঘল সেনাপতি মানসিংহ এবং নবাব আলীবর্দি খাঁর স্মৃতি বিজোড়িত এই আমঝুপিতেই পলাশীর পরাজয়ের নীলনকশা রচিত হয়েছিল। কথিত আছে এই নীলকুঠিই ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ লয়েড ও মীরজাফরের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের শেষ বৈঠক হয়েছিল। যার পরের গল্প অত্যাচার আর নির্যাতনের। মনে করা হয় আমঝুপি ষড়যন্ত্রের ফলাফল সিরাজ-উদ-দৌলার পতন। ফলাফল বাঙালিদের স্বাধীনতা হারিয়ে পরাধীনতা গ্রহণ। যদিও এটা নিয়ে আবা ইতহাসবেত্তাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিমত রয়েছে।

আবার গৌরব গাঁথা হচ্ছে বঞ্চিত এবং অত্যাচার আর নির্যাতিত নীলচাষিরাই এক সময় দূর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে ইংরেজদের পরাজিত করে বন্ধ করে নীলচাষ।

আমঝুপি নীলকুঠিতে দেশীয় স্থাপত্যের সাথে ইউরোপীয় স্থাপত্য বিশেষ করে ব্রিটিশ স্থাপত্যে রীতির সংমিশ্রণ ঘটেছে। মূল কুঠি ভবনের বহির্বিভাগ দেখে এর সামগ্রিক অবস্থা অনুধাবন সম্ভব নয়। অভ্যন্তর ভাগের অবস্থা রহস্যাবৃত। ভবনটিতে প্রবেশের দুটি পথ আছে। মূল প্রবেশ পথ এবং ভবনের সম্মুখ ভাগ কাজলা নদীর দিকে। কারন তৎকালে নদী পথেই চলত সকল যোগাযোগ। তাছাড়া জানা যায় নীলকরদের নৌযান এসে এখানেই থামতো। ঢুকতো এ পথ দিয়েই। নদীর মাঝ থেকে একটি শান বাধানো সিড়ি উঠে এসেছে মূল ভবনের সম্মুখ ভাগের বাগানে। এটি তৎকালে কাঠ দ্বারা নির্মিত ছিল। এ বাগানের ভিতর দিয়ে ভবনটির বারান্দায় উঠতে হয়। এটিই ভবনটির প্রধান প্রবেশ পথ। কুঠিবাড়ির মূল ভবনটি সূদৃশ্য একতলা ভবন। এর অভ্যন্তরে রয়েছে মোট পনেরটি কক্ষ। স্তম্ভ সারির ওপরে লাল টালির ছাদ-আচ্ছাদিত বারান্দা। তিনটি করে স্তম্ভ একত্রে স্থাপিত, যার ওপর সৃষ্ট ঢালু ছাদের বারান্দা আকর্ষণীয় রুপ লাভ করেছে। বারান্দা পার হয়ে প্রবেশ করতে হয় কুঠির অভ্যন্তরে।

ভেতরে রয়েছে মস্ত বড় একটা হল ঘর। নীলকুঠির কক্ষগুলোর মধ্যে এটিই সর্ববৃহৎ। কাঠের মেঝে যুক্ত অর্ধগোলাকার এই কক্ষের এক কোনায় একটা ফায়ার প্লেস। কক্ষটির সামনের দেয়ালের উপরিভাগে টাঙানো বড় একটি মহিষের মাথা। এর দুপাশে আরো অনেকগুলো ঘর। এর কোনটিতে বসত নাচের আসর। কোনটায় ঝাড়বাতির আলোর নীচে লুন্ঠিত হত বাঙ্গালী নারীর সতীত্ব। কোনটাতে চলতো নীলচাষীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন। জানা যায় এটি ছিল জলসা ঘর।

এই নীলকুঠিতে আছে আরো কয়েকটি ছোট-বড় কক্ষ। এসব কক্ষ ব্যবহৃত হতো বৈঠকখানা, সংগীত, নৃত্যগীত এবং আমোদ-প্রমোদ করার জন্য। এর সাথে রয়েছে চারটি সাজঘর ও পরিচারকদের কোয়ার্টার। পশ্চিম দিকে অবস্থিত পরিচারকদের ও সাহায্যকারীদের বসবাসের দালান যা বর্তমানে কুঠিবাড়ির নিরাপত্তাকর্মীদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ছোট-বড় কক্ষগুলির মধ্যে একটি কক্ষের মেঝে বিশেষ পদ্ধতিতে নির্মিত। আমঝুপি গ্রামে সাপের প্রাদুর্ভাব ছিল বলে জানা গেছে। কুঠিবাড়ি নির্মাণের সময় সাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কক্ষটির মেঝে মার্বেল পাথর দিয়ে অত্যন্ত মসৃণ এবং ঢালু যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছিল। এমন ঢালু মেঝে তৈরি করার নেপথ্যে যেন সাপ প্রবেশ করতে না পারে সে কথাটি মনে রাখা হয়েছিল। এ ভবনে রয়েছে তিনটি শয়ন কক্ষ। পেছন দিকে রয়েছে ভোজনকক্ষ। কক্ষগুলোর উপরিভাগে রয়েছে রঙিন কাঁচে আবৃত গোলাকার ক্ষুদ্র আলো প্রবেশের জানালা। জনশ্রুতি আছে, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে পলাশী যুদ্ধের প্রথম বৈঠক এই গোপন কক্ষটিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখানেই লর্ড ক্লাইভ, ঘসেটি বেগম, মীর জাফরসহ অন্য ষড়যন্ত্রকারীরা পলাশী যুদ্ধের নীল নকশা তৈরী করেছিল।

বাকি তিনটি কক্ষ তুলনামূলক ছোট আকারের। বাড়ির মোট রুমের সংখ্যা ১৫টি। এখন যেটা কুঠিবাড়ির পেছনের দিক, সেসময় সেটাই ছিল সামনের দিক। এই দিকেই কাজলা নদী।

কুঠিবাড়ির ভেতরে আজও  রয়ে গেছে ইংরেজদের ব্যবহার করা চেয়ার, টেবিল, খাট, মহিষের শিং ইত্যাদি। ঘরগুলোর মেঝে অত্যন্ত মসৃন। কয়েক শতাব্দী আগের বানানো এ মেঝের মসৃণতা এ যুগেও বিস্ময়কর। কাজলা নদীর ওপর পর্যন্ত সম্প্রসারিত সেতু, শান বাঁধানো বসার আসনবেষ্টিত ঘাট নিঃসন্দেহে এই কুঠির সবচে চিত্তাকর্ষক ও ব্যাতিক্রমী বৈশিষ্ট্য। কুঠিভবনটির দৈর্ঘ ১৫ মিটার, প্রস্থ ১০ মিটার ও উচ্চতা প্রায় ৮ মিটার। এতে রয়েছে দুটি প্রবেশ পথ ও ১৮টি জানালা। আমঝুপি কুঠিবাড়ির পূর্বদিকে রয়েছে একটি মনোরম ফুলের বাগান। কুঠিবাড়ির আম্রকাননের পাশাপাশি রয়েছে ইংরেজ আমলে লাগানো বেশ কিছু নাম না জানা বিশাল আকৃতির গাছ। দক্ষিণ দিকে কাজলা নদীর কোল ঘেঁষে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে নারিকেল গাছ। এসব গাছ ও বাগানের মনোরম নৈসর্গিক পরিবেশ কুঠিবাড়ির স্থাপত্যে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা, যা আমঝুপি নীলকুঠির নিথর পরিবেশকে করে তুলেছে প্রাণবন্ত।

সাধারণ জনগণের ধারণা, এ ভবনটির ভেতরের তলায় রয়েছে আরো একটি ভূর্গভস্থ কক্ষ, যা গোপন অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এ কক্ষটির মেঝেতে রয়েছে একটি কূপ, যার ব্যবহার রহস্যাবৃত। অনেকের মতে এটি ব্যবহৃত হত গোপন সুরঙ্গ হিসাবে, যার শেষ মাথা নদীতে গিয়ে মিশেছে। নীলকরদের অত্যাচারে নিহতদেরকেও এই সুরঙ্গ পথে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হত।

মূল ভবনের পাশেই রয়েছে পায়রার খোপ বা ঘর। জানা যায় এসব পায়রা ছিল প্রশিক্ষিত, যাদের দিয়ে চিঠি আদান-প্রদান করা হত।

মূল ভবনের উত্তর-পশ্চিমে ছিল নীল হাউজ। এখানে বড় বড় হাউজে নীল গাছের কান্ড পানিতে ভিজিয়ে রাখা হত। অতপর নীল গাছ পঁচা পানি শুকিয়ে নীল উৎপাদন করা হত। এখন শুধু নীল হাউজটির পশ্চিম পাশের দেয়ালের ভগ্নাংশ বাদে বাকিটা বিলীন হয়ে গেছে।

নীল হাউজের উত্তরে ছিল টেনিস কোর্ট ও হাওয়া খানা। টেনিস কোর্টের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না আর হাওয়া খানার স্থলে পরবর্তিতে ছোট একটি স্থাপনা নির্মান করা হয়েছে। ক্ষুদ্রাকৃতির অপেক্ষাকৃত মজবুত ভবন টি, একসময় খেলার পর বিশ্রামাগার ও গোপন শলা-পরামর্শ করার বৈঠকখানা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এর উত্তরে আছে আমলা ঘর। এটি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা-লম্বি ও উভয় পাশে কক্ষ বিশিষ্ট একতলা ভবন। উভয় পাশের কক্ষগুলোর সামনে টানা বারান্দা আছে।

মেহেরপুরের মুজিবনগর:

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর উপজেলায় (পূর্ব নাম: ভবেরপাড়া বৈদ্যনাথতলা) বহু সাংবাদিকদের সামনে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী । আমাদের স্বাধীনতার গৌরবগাথায় তাই এই বৈদ্যনাথতলা এক ইতিহাসে হয়ে আছে। পরবর্তীকালে এ বৈদ্যনাথতলার নতুন নাম হয়েছে মুজিবনগর।

১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল পাকবাহিনী মেহেরপুর শহরের আমঝুপিতে ৮ জন নিরীহ লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এখানে রয়েছে সারি সারি আমগাছ। অগণিত আমগাছে ঘেরা এটি এখন আম্রকাননে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণের  স্মৃতিকে অম্লান করে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে শপথগ্রহণের স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভবিষ্যৎ বংশ ধরদের তুলে ধরতে এ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ
করেন। স্থপতি তানভীর করিম জাতীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের সাথে সংগতি রেখে এ স্মৃতিসৌধের মূল নকশা তৈরি করেন।

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের বিশেষ তাৎপর্য:

          একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতীক: স্মৃতিসৌধের মূল ফটকের রাস্তাটি মূল স্মৃতিসৌধের রক্তের সাগর নামক ঢালকে স্পর্শ করেছে। এখানে রাস্তাটি ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

          লাল মঞ্চ: ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার যে স্থানে শপথ গ্রহণ করে ঠিক সেই স্থানে ২৪ ফুট দীর্ঘ ও ১৪ ফুট প্রশস্ত সিরামিকের ইট দিয়ে একটি আয়তকার লাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। যা মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ভিতেরের মাঝখানে।

২৩টি স্মৃতি স্তম্ভ: স্মৃতিসৌধটি ২৩ টি ত্রিভূজাকৃতি দেয়ালের সমন্বয়ে গঠিত। যা বৃত্তাকার উপায়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। ২৩ টি দেয়াল [আগষ্ট ১৯৪৭] থেকে [র্মাচ ১৯৭১]- এই ২৩ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম দেয়ালটির উচ্চতা ৯ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। পরবর্তী প্রতিটি দেয়ালকে ক্রমান্বয়ে দৈর্ঘ্য ১ ফুট ও উচ্চতা ৯ ইঞ্চি করে বাড়ানো হয়েছে। যা দ্বারা বুঝানো হয়েছে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার জন্য ৯ মাস ধরে যুদ্ধ করেছিল। শেষ দেয়ালের উচ্চতা ২৫ ফুট ৬ ইঞ্চি ও দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট। প্রতিটি দেয়ালের ফাঁকে অসংখ্য ছিদ্র আছে যেগুলোকে পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচারের চিহ্ন হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে।

এক লক্ষ বুদ্ধিজীবীর খুলি:স্মৃতিসৌধটির ভূমি থেকে ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উঁচু বেদীতে অসংখ্য গোলাকার বৃত্ত রয়েছে যা দ্বারা ১ লক্ষ বুদ্ধিজীবির খুলিকে বোঝানো হয়েছে।

ত্রিশ লক্ষ শহীদ:স্মৃতিসৌধের ভূমি থেকে ৩ ফুট উচ্চতার বেদীতে অসংখ্য পাথর রয়েছে যা দ্বারা ৩০ লক্ষ শহীদ ও মা-বোনের সম্মানের প্রতি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও স্মৃতিচারণা প্রকাশ করা হয়েছে। পাথরগুলো মাঝখানে ১৯টি রেখা দ্বারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের ১৯টি জেলাকে বুঝানো হয়েছে।

এগারোটি সিঁড়ি:স্মৃতিসৌধের বেদীতে আরোহণের জন্য ১১টি সিঁড়ি রয়েছে। যা দ্বারা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সমগ্র বাংলাদেশকে যে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল তা বুঝানো হয়েছে।

বঙ্গোপসাগর:স্মৃতিসৌধের উত্তর পাশের আম বাগান ঘেঁষা স্থানটিতে মোজাইক করা আছে তার দ্বারা বঙ্গোপসাগর বোঝানো হয়েছে। বঙ্গোপসাগর যদিও বাংলাদেশের দক্ষিণে, কিন্তু শপথ গ্রহণের মঞ্চটির সাথে স্মৃতিসৌধের সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য এখানে এটিকে উত্তর দিকে স্থান দেয়া হয়েছে।

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল ২৩ বছর এ লক্ষ্যে ২৩টি কংক্রিটের ত্রিকোণ দেয়ালের সমন্বয় উদীয়মান সূর্যের প্রতিকৃতি।

রক্তের সাগর: স্মৃতিসৌধের পশ্চিম পাশে প্রথম দেয়ালের পাশ দিয়ে শহীদের রক্তের প্রবাহ তৈরি করা হয়েছে যাকে রক্তের সাগর বলা হয়।

সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ জনতা: লাল মঞ্চ থেকে যে ২৩টি দেয়াল তৈরি করা হয়েছে তার ফাঁকে অসংখ্য নুরি-পাথর দ্বারা মোজাইক করে লাগানো হয়েছে। যা দিয়ে ১৯৭১ সালের সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ জনতাকে প্রতীক আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানের আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলার লক্ষ্যে উক্ত কমপ্লেক্সে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে দেখানো  হয়েছে। এই কমপ্লেক্স মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীর স্মারক ম্যূরাল স্থাপন করা হয়েছে। সার্বিকভাবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স, ঐতিহাসিক  আম্রকানন, ঐতিহাসিক ছয় দফার রূপক উপস্থাপনকারী ছয় ধাপের গোলাপ বাগান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত প্রদর্শন হিসাবে বিবেচিত হবার দাবী  রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভিতরের অংশে মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। স্মৃতি কমপ্লেক্সের বাইরের অংশে বঙ্গবন্ধুর  ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ এবং পাকিস্থানি বাহিনীর আত্নসমর্পণ এর দৃশ্যসহ আরও ঐতিহাসিক ঘটনার ভাস্কর্য স্থাপন করা  হয়েছে।  মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত উক্ত ভাস্কর্যগুলি যেকোন বিদগ্ধ পর্যটককে আকর্ষণ করবে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান বাংলাদেশের মানচিত্রে প্রদর্শন করে মানচিত্রটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরস্থ মূল আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয়েছে।  সুদৃশ্য এ মানচিত্রটি মুক্তযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী সম্পর্কিত এক প্রমাণ্যচিত্র।

দ্রষ্টব্য: আমার এই লেখার ব্যাপারে   কোন মতামত থাকলে প্লিজ আমাকে ই-মেইল বার্তা পাঠান(akhtar62bd@gmail.com); সকল তথ্যসূত্র নিচে দেয়া হয়েছে।